ইচ্ছে মৃত্যু

Photo: ইচ্ছে মৃত্যু "লিখেছেন – মোরশেদা কাইয়ুমী। কেমন একটা দম বন্ধ করা কষ্ট দলা পাকিয়ে গলার কাছে আটকে আছে ,আধো ঘুম আধো জাগরনে প্রতিটি মূহুর্ত যেন কয়েক যুগ মনে হচ্ছে তার ।নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে যেন ।সীমাহীন অন্ধকারে নিজেকে কেন যেন কবরের বাসিন্দা মনে হয় তার ।হঠাত্‍ পাশের ঘর থেকে কান্নার আওয়াজ আসে ,কবরেতো কান্না শুনার কথানা !নাহ্ !আইজ আর মনে অয় সকাল অইবোনা,আপন মনে বিড়বিড় করতে করতে উঠে বসে ,ভাঙ্গা বেড়ার ফাঁক দিয়ে চাঁদের আলোটাও আজ আর চোখে পড়েনা ।মনে হয় মেঘ জমেছে আকাশে ।দরজা খুলে বেরুতে যাবে আবার সেই কাশির শব্দ ,কাশতে কাশতে চোখে পানি চলে আসে মানুষটার ।একরকম মুখবাঁকা করেই আবার বিছানায় ফিরে আসে ,পানি এগিয়ে দেয় তার দিকে ।জন্মের পর বেশ শখ করেই শিল্পী নামটা রাখা হয়েছিল ,নামটা রেখেছিল তার বাবা ।হুম্ শিল্পী,শিল্পী বেগম ।ক্লাস সিক্স পর্যন্ত সব ঠিকই,ছোট্টমনে ততদিনে স্বপ্নের বীজ বুনে দিয়েছেন সযত্নে ।কিন্তু যেদিন খবর আসলো ট্রাক চাপায় তার বাবা মারা গেছে সেদিনই সব উলট পালট হয়ে গেল । শিল্পী এখনো মনে করতে পারে সে কিভাবে দিয়ে এসেছিল তার বাবাকে ঐ পুকুর পাড়ের কবরটাতে,আজও সে তার বাবার সেই মায়া ভরা মুখখানা মনে করতে পারে ।সত্যি বাপ আমার আর কয়েকটা বছর বাইচা থাকলে আমার জীবনটা এমন হইতনা , শিল্পী প্রায় সময় দুঃখ করে বলে ।বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে শিল্পীতার নানির কাছেই থাকে..মায়ের বিয়ে হয়ে গেছে আরেক জায়গায় ,চারপাশের মানুষগুলোর অবহেলায় যখন সে জর্জরিত তখনি চোখে তার ঘোর লাগে ,অজানা স্বপ্নে মনটা আলোকিত হয়ে যায় ।সৌরভের দিপ্ত পথ চলা ,তাকে মুগ্ধ করে রাখতো সবসময়,মাত্র সেনাবাহিনীর ট্রেনিং শেষ করে এসেছে সৌরভ ।ছোট্ট মনে নানা স্বপ্ন বুনতে থাকে ,লিখাপড়া করে অনেক বড় হবে সে ,তারপর সৌরভকে নিয়ে ...কেমন যেন লজ্জা পেতো সৌরভের নাম মনে এলেও ,অদ্ভুত একটা শিহরণ বয়ে যেতো শরীরে ।অবাক চোখে লাবনী ম্যাডামের দিকেচেয়ে থাকতো ।এত্তো ভালবাসতো তাকে ,যতক্ষণ ম্যাডাম ক্লাসে থাকতো একটা ঘোরের মধ্যে থাকতো,তাকেও যে হতেই হবে এমন ।স্কুলে যেতে তার খুব ভাল লাগতো ।যদিও নানী ,মামারা অনেক বার চেয়েছে স্কুল বন্ধ করে দিতে ,তাওলাবনী ম্যাডামের জন্য পারেনি ।ম্যাডাম নিজেই ওর দায়িত্ব নিয়েছিলো ।কিন্তু শেষ রক্ষাটা করতে পারেনি ম্যাডাম অনেক চেষ্টার পরও ।এইটে পড়ার সময় মামারা মাঝ বয়সি একটা পশুর সাথে তার বিয়ে দিয়ে দেয় ,সেই থেকে এই বস্তির খুপরিতেওর জীবন আটকে যায় ,থমকে থাকে ওর এইটপাশ স্বপ্নগুলোও !ইচ্ছে ছিলো নিজের অপূর্ণ স্বপ্নগুলো মেয়েকে দিয়ে পুরণ করবে ,লাবনীম্যাডামের মত চোখে চশমা দিয়ে পড়াবে তার মেয়ে ।কিন্তু ...বৃষ্টির ফোঁটা মাথায় পড়তেই চমকেউঠে শিল্পি ,রাত কত হলো কে জানে!আজকের রাতটা এতো লম্বা ক্যান ?পাশ ফিরে দেখে পশুটা কেমন ছোট্ট শিশুর মত নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে!হায়রে মানুষ !এতটা নিষ্ঠুর কেমনে হয় ?এতটা মায়ামমতাহীন ?বৃষ্টি পড়ছে ঘরের বিভিন্ন জায়গায় ,বাতাসে মনে হচ্ছে ঘরটাও উড়িয়ে নিয়ে যাবে ।ও উঠে পাতিল বসিয়ে দেয় ।হায়রে সর্বনাশা বৃষ্টি !কত্ত প্রিয় ছিলো তার ,লাবনী ম্যাডাম তাকে বৃষ্টিকে ভালবাসতে শিখিয়েছিল ।তিনি ও কি যে পছন্দ করতেন বৃষ্টিতে ভিজতে ।কত শখ করে বড় মেয়ের নাম রেখেছিলোবৃষ্টি ।কে জানতো তার জীবনটা এমন চোখের বৃষ্টিতে ভিজতে থাকবে আজীবন ?হ্যাঁ এই পশুটা তাকে সন্তান উত্‍পাদনের মিশিন বানিয়ে ফেলেছিল ।একে একে সাতটা সন্তান জন্ম দেয় সে ।পাঁচ ছেলে দুই মেয়ে,ছেলেরা সবাই বিয়ে করে আলাদা থাকে ,বাবা মায়ের খোঁজ নেয়ার প্রয়োজন মনে করেনা তারা ।একটাকেও সে নিজের মত মানুষ করতে পারেনিসে ,স্কুলে দিতে চেয়েছিল মেয়েটাকে ,বড় ছেলেটাকে ও কিন্তু মানুষটা উল্টো তাকে মেরে রক্তাক্ত করে বলেছিলো খাওনজোগানের খেমতা নাই ,পোলারে জজ ব্যরিস্টার বানাইবো ,বেঢির শখ কতো !এখন আর মনে কোন স্বপ্ন অবশিষ্ট নেই আর ।সবকটা স্বপ্ন পশুটা একে একে গলাটিপে মেরে ফেলেছে নৃশংস ভাবে ।এ জন্য তার আর খুব একটা আক্ষেপ ও লাগেনা তেমন ।তার সব চিন্তা সব কষ্ট কেবল বৃষ্টিকে ঘিরে ।বৃষ্টি নামটা নিয়ে অনেক বকাবকি করেছিলো মানুষটা ,বলে এইডা একটা নাম অইলো ?এইডা বড় লোকের বেঢিগো নাম ।বৃষ্টি আইলে এমনে বাঁচিনা,ঘরে পানির ঢল নামে আর মাইয়ার নাম রাখছে বৃষ্টি !কি জালায় পরলাম !তিন ছেলের পর বৃষ্টির জন্ম,ধবধবে ফরসা পরীর মত মেয়েটা সবার মন কেড়ে নিয়েছিলো পৃথিবীতে এসেই ।কিন্তু বয়স যখন বাড়তে লাগলো দেখা গেল কথা বলতে পারেনা ও ।ডাক্তার যখন বললো মেয়েটা জন্মগত বোবা ,সেদিন শিল্পি অনেক কেঁদেছিলো চিত্‍কার করে ,হায় আল্লাহ !এইডা কি করলা !কি হইবো আমার মাইয়াটার ?সেই থেকে সবার তুচ্ছতাচ্ছিল্য ওর সার্বক্ষণিক সঙ্গী হয়ে উঠলো ।পশুটাও কোনদিন মেয়েটাকে কোলে তুলে নেয়নি ,কাছে আসলেই দূরদূর করে তাড়িয়ে দিতো ।বাইরে থেকে যা আনতো সব ছেলেদেরকে ছোট মেয়েটা কে দিয়ে দিতো ভাগ করে কিন্তু বৃষ্টির ভাগে কিছুই পড়তোনা ।মায়ের আঁচলই ছিলো তার একমাত্র আশ্রয়স্থল ,অঝোরধারায় কাঁদতো শুধু সে ,যেন বৃষ্টি নামটা স্বার্থক করতেই ।সেই সাথে কাঁদতো শিল্পিও ,ও কোন প্রতিবাদ করলে ওকে মারতো খুব পশুটা।এইভাবেই কাটছিলো দিন ,মা লুকিয়ে লুকিয়ে ওকে খাইয়ে দিতো ,যতটা পারতো আগলে রাখতো চারপাশের অবহেলা ,তাচ্ছিল্য থেকে ।কেউ তাকে বৃষ্টি ডাকতোওনা ,সবাই ডাকতো বোবোনি বলে ।একে সবাই বড় হয়ে উঠলো,ছোটমেয়েটার ও বিয়ে দিয়ে দিলো ।না বৃষ্টির জন্য বিয়ের চিন্তাও করেনি কেউ ,ছেলেগুলো যে যার মত আলাদা হয়ে গেল ।দূরে কোথাও একটা কুকুর ডেকে উঠলো করুণ স্বরে ,শিল্পি আবারো চমকে বাস্তবে ফিরে এলো ।আজ যেন সমস্ত অতীত ওর চোখের সামনে ভেসে উঠছে ।কিছুতেই দুচোখের পাতা এক করতে পারছেনা,কিভাবে পারবে ?কোন মা কি পারে এমন নিশ্চিন্তে ঘুমোতে?সকাল কেন হয়না আজ ?কয়টা বাজে কে জানে ।আবার ফিরে যায় অতীত ভাবনায় ।হঠাত্‍ একদিন রিক্সা চালাতে গিয়ে এক্সিডেন্টে পা হারিয়ে পঙ্গু হয়ে গেল মানুষটা ।মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়লো তার ।কি করে চলবে সংসার?চিকিত্‍সার খরচ জোগাবে কে ?না কেউ ফিরে তাকায়নি ,সবাই যে যার সংসার নিয়ে ব্যস্ত ।বৃষ্টির চোখে নতুন জলেরধারা !না নিজের কষ্টে না ,ওর বাবার কষ্টে , যাকে ও বাবা বলে ডাকতে পারেনি কোনদিন ।যার এতটুকু ভালবাসা যার ভাগ্যে জুটেনি ।তিনদিন হলো চুলোয় হাঁড়ি উঠেনি ঘরে ।অর্ধাহারে অনাহারে কত আর থাকা যায় ?সবার দুয়ারে হাত পেতেও লাভ হয়নি কোন ,একবেলা খাওয়া জুটেনা যাদের তারা কিভাবে চিকিত্‍সা করাবে পঙ্গু মানুষটাকে ?সেই মূহুর্তে পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলো বৃষ্টির ছোটবেলার সাথী বিলকিস ।বেশ কিছু টাকা দিয়ে নিজে গিয়ে চাল ডাল কিনে দিয়ে যায় রাতের অন্ধকারে ।সেও এমনি এক অভাগি অভাবের সাথে লড়তে লড়তে এক সময় অন্ধকার জগতে পা বাড়ায় ।শুরুতে কিছুটা কানাঘুষা হয়েছিলো ,কিন্তু বস্তিতে কে কার খবর রাখে ?সবাই নিজের পেটের ধান্দায় ব্যস্ত ।যারা অভাবের সময় দূরদূর করে তাড়িয়ে দিয়েছিল কুকুরের মত এখন তাদেরকে দেখিয়েই গরিব ফকিরকে টাকা দিয়ে ও তৃপ্তি পায় বিলকিস।নিজের জীবনটাতো গেছেই পাপের পথে ,অন্যকে যদি কিছুটা সাহায্য করে দোষ কি ?বৃষ্টিদের অভাব দেখে বলছিলো কয়েকবার ,কিন্তু ওকে রাজি করাতে পারেনি ,বৃষ্টি কথা বলতে না পারলেও সব বুঝতো ,সব বুঝাতে পারতো ।বিশেষ করে বিলকিসের সাথেতার বেশ সখ্যতা ছিলো ।শেষ পর্যন্ত বাবাকে বাঁচাতে নিজেকে মৃত্যুর পথে ঠেলে দেয় বৃষ্টি ।নিষিদ্ধ পল্লির এইসব বালিকারা কতটা কষ্টে প্রতিদিন নতুন করে নিজেকে ইচ্ছে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয় তার খবর কে রাখে ?ভোরের আলো ফুটে উঠছে চারদিকে,মুয়াজ্জিনের আযান শুনে শিল্পির চেতনা ফিরে আসে যেন ।কিছুতেই ফেরাতে পারেনি বৃষ্টিকে ,বাবার প্রতি বৃষ্টির এ কেমন ভালবাসা?যে তাকে ঘৃণা করে আসছে সারাটা জীবন !শিল্পির মাথায় কিছুতেই ধরেনা ব্যপারটা,লাবনী ম্যাডাম বোধহয় কইতে পারবো এইডারে ভালবাসা কয় নাকি?এইডা কেমুন ভালবাসা ?একটু পরে দরজায় টোকা পড়ে নিঃশব্দে এসে ঢুকে বৃষ্টি,নিজেকে বিক্রি করে,নিজের স্বত্তার মৃত্যুর বিনিময়ে একমুঠো টাকা এসে মায়ের আঁচলে বেঁধে দেয় !হতবাক মা মেয়েকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে ।বৃষ্টির চোখে আজ আর কোন জল নেই,সব জল চুষে নিয়েছে শকুনের দল ।

কেমন একটা দম বন্ধ করা কষ্ট দলা পাকিয়ে গলার কাছে আটকে আছে ,আধো ঘুম আধো জাগরনে প্রতিটি মূহুর্ত যেন কয়েক যুগ মনে হচ্ছে তার ।নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে যেন ।সীমাহীন অন্ধকারে নিজেকে কেন যেন কবরের বাসিন্দা মনে হয় তার ।হঠাত্‍ পাশের ঘর থেকে কান্নার আওয়াজ আসে ,কবরেতো কান্না শুনার কথানা !
নাহ্ !আইজ আর মনে অয় সকাল অইবোনা,আপন মনে বিড়বিড় করতে করতে উঠে বসে ,ভাঙ্গা বেড়ার ফাঁক দিয়ে চাঁদের আলোটাও আজ আর চোখে পড়েনা ।মনে হয় মেঘ জমেছে আকাশে ।দরজা খুলে বেরুতে যাবে আবার সেই কাশির শব্দ ,কাশতে কাশতে চোখে পানি চলে আসে মানুষটার ।একরকম মুখবাঁকা করেই আবার বিছানায় ফিরে আসে ,পানি এগিয়ে দেয় তার দিকে ।

জন্মের পর বেশ শখ করেই শিল্পী নামটা রাখা হয়েছিল ,নামটা রেখেছিল তার বাবা ।হুম্ শিল্পী,শিল্পী বেগম ।ক্লাস সিক্স পর্যন্ত সব ঠিকই,ছোট্টমনে ততদিনে স্বপ্নের বীজ বুনে দিয়েছেন সযত্নে ।কিন্তু যেদিন খবর আসলো ট্রাক চাপায় তার বাবা মারা গেছে সেদিনই সব উলট পালট হয়ে গেল । শিল্পী এখনো মনে করতে পারে সে কিভাবে দিয়ে এসেছিল তার বাবাকে ঐ পুকুর পাড়ের কবরটাতে,আজও সে তার বাবার সেই মায়া ভরা মুখখানা মনে করতে পারে ।
সত্যি বাপ আমার আর কয়েকটা বছর বাইচা থাকলে আমার জীবনটা এমন হইতনা , শিল্পী প্রায় সময় দুঃখ করে বলে ।
বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে শিল্পীতার নানির কাছেই থাকে..মায়ের বিয়ে হয়ে গেছে আরেক জায়গায় ,
চারপাশের মানুষগুলোর অবহেলায় যখন সে জর্জরিত তখনি চোখে তার ঘোর লাগে ,অজানা স্বপ্নে মনটা আলোকিত হয়ে যায় ।সৌরভের দিপ্ত পথ চলা ,তাকে মুগ্ধ করে রাখতো সবসময়,মাত্র সেনাবাহিনীর ট্রেনিং শেষ করে এসেছে সৌরভ ।ছোট্ট মনে নানা স্বপ্ন বুনতে থাকে ,লিখাপড়া করে অনেক বড় হবে সে ,তারপর সৌরভকে নিয়ে …কেমন যেন লজ্জা পেতো সৌরভের নাম মনে এলেও ,অদ্ভুত একটা শিহরণ বয়ে যেতো শরীরে ।
অবাক চোখে লাবনী ম্যাডামের দিকেচেয়ে থাকতো ।এত্তো ভালবাসতো তাকে ,যতক্ষণ ম্যাডাম ক্লাসে থাকতো একটা ঘোরের মধ্যে থাকতো,তাকেও যে হতেই হবে এমন ।স্কুলে যেতে তার খুব ভাল লাগতো ।যদিও নানী ,মামারা অনেক বার চেয়েছে স্কুল বন্ধ করে দিতে ,তাওলাবনী ম্যাডামের জন্য পারেনি ।ম্যাডাম নিজেই ওর দায়িত্ব নিয়েছিলো ।কিন্তু শেষ রক্ষাটা করতে পারেনি ম্যাডাম অনেক চেষ্টার পরও ।
এইটে পড়ার সময় মামারা মাঝ বয়সি একটা পশুর সাথে তার বিয়ে দিয়ে দেয় ,সেই থেকে এই বস্তির খুপরিতেওর জীবন আটকে যায় ,থমকে থাকে ওর এইটপাশ স্বপ্নগুলোও !
ইচ্ছে ছিলো নিজের অপূর্ণ স্বপ্নগুলো মেয়েকে দিয়ে পুরণ করবে ,লাবনীম্যাডামের মত চোখে চশমা দিয়ে পড়াবে তার মেয়ে ।কিন্তু …
বৃষ্টির ফোঁটা মাথায় পড়তেই চমকেউঠে শিল্পি ,রাত কত হলো কে জানে!আজকের রাতটা এতো লম্বা ক্যান ?
পাশ ফিরে দেখে পশুটা কেমন ছোট্ট শিশুর মত নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে!হায়রে মানুষ !এতটা নিষ্ঠুর কেমনে হয় ?এতটা মায়ামমতাহীন ?
বৃষ্টি পড়ছে ঘরের বিভিন্ন জায়গায় ,বাতাসে মনে হচ্ছে ঘরটাও উড়িয়ে নিয়ে যাবে ।ও উঠে পাতিল বসিয়ে দেয় ।
হায়রে সর্বনাশা বৃষ্টি !কত্ত প্রিয় ছিলো তার ,লাবনী ম্যাডাম তাকে বৃষ্টিকে ভালবাসতে শিখিয়েছিল ।তিনি ও কি যে পছন্দ করতেন বৃষ্টিতে ভিজতে ।
কত শখ করে বড় মেয়ের নাম রেখেছিলোবৃষ্টি ।কে জানতো তার জীবনটা এমন চোখের বৃষ্টিতে ভিজতে থাকবে আজীবন ?
হ্যাঁ এই পশুটা তাকে সন্তান উত্‍পাদনের মিশিন বানিয়ে ফেলেছিল ।একে একে সাতটা সন্তান জন্ম দেয় সে ।পাঁচ ছেলে দুই মেয়ে,ছেলেরা সবাই বিয়ে করে আলাদা থাকে ,বাবা মায়ের খোঁজ নেয়ার প্রয়োজন মনে করেনা তারা ।একটাকেও সে নিজের মত মানুষ করতে পারেনিসে ,স্কুলে দিতে চেয়েছিল মেয়েটাকে ,বড় ছেলেটাকে ও কিন্তু মানুষটা উল্টো তাকে মেরে রক্তাক্ত করে বলেছিলো খাওনজোগানের খেমতা নাই ,পোলারে জজ ব্যরিস্টার বানাইবো ,বেঢির শখ কতো !
এখন আর মনে কোন স্বপ্ন অবশিষ্ট নেই আর ।সবকটা স্বপ্ন পশুটা একে একে গলাটিপে মেরে ফেলেছে নৃশংস ভাবে ।এ জন্য তার আর খুব একটা আক্ষেপ ও লাগেনা তেমন ।তার সব চিন্তা সব কষ্ট কেবল বৃষ্টিকে ঘিরে ।
বৃষ্টি নামটা নিয়ে অনেক বকাবকি করেছিলো মানুষটা ,বলে এইডা একটা নাম অইলো ?এইডা বড় লোকের বেঢিগো নাম ।বৃষ্টি আইলে এমনে বাঁচিনা,ঘরে পানির ঢল নামে আর মাইয়ার নাম রাখছে বৃষ্টি !কি জালায় পরলাম !

তিন ছেলের পর বৃষ্টির জন্ম,ধবধবে ফরসা পরীর মত মেয়েটা সবার মন কেড়ে নিয়েছিলো পৃথিবীতে এসেই ।কিন্তু বয়স যখন বাড়তে লাগলো দেখা গেল কথা বলতে পারেনা ও ।ডাক্তার যখন বললো মেয়েটা জন্মগত বোবা ,সেদিন শিল্পি অনেক কেঁদেছিলো চিত্‍কার করে ,হায় আল্লাহ !এইডা কি করলা !কি হইবো আমার মাইয়াটার ?
সেই থেকে সবার তুচ্ছতাচ্ছিল্য ওর সার্বক্ষণিক সঙ্গী হয়ে উঠলো ।
পশুটাও কোনদিন মেয়েটাকে কোলে তুলে নেয়নি ,কাছে আসলেই দূরদূর করে তাড়িয়ে দিতো ।বাইরে থেকে যা আনতো সব ছেলেদেরকে ছোট মেয়েটা কে দিয়ে দিতো ভাগ করে কিন্তু বৃষ্টির ভাগে কিছুই পড়তোনা ।মায়ের আঁচলই ছিলো তার একমাত্র আশ্রয়স্থল ,অঝোরধারায় কাঁদতো শুধু সে ,যেন বৃষ্টি নামটা স্বার্থক করতেই ।

সেই সাথে কাঁদতো শিল্পিও ,ও কোন প্রতিবাদ করলে ওকে মারতো খুব পশুটা।

এইভাবেই কাটছিলো দিন ,মা লুকিয়ে লুকিয়ে ওকে খাইয়ে দিতো ,যতটা পারতো আগলে রাখতো চারপাশের অবহেলা ,তাচ্ছিল্য থেকে ।কেউ তাকে বৃষ্টি ডাকতোওনা ,সবাই ডাকতো বোবোনি বলে ।

একে সবাই বড় হয়ে উঠলো,ছোটমেয়েটার ও বিয়ে দিয়ে দিলো ।না বৃষ্টির জন্য বিয়ের চিন্তাও করেনি কেউ ,ছেলেগুলো যে যার মত আলাদা হয়ে গেল ।

দূরে কোথাও একটা কুকুর ডেকে উঠলো করুণ স্বরে ,শিল্পি আবারো চমকে বাস্তবে ফিরে এলো ।

আজ যেন সমস্ত অতীত ওর চোখের সামনে ভেসে উঠছে ।কিছুতেই দুচোখের পাতা এক করতে পারছেনা,কিভাবে পারবে ?কোন মা কি পারে এমন নিশ্চিন্তে ঘুমোতে?সকাল কেন হয়না আজ ?কয়টা বাজে কে জানে ।

আবার ফিরে যায় অতীত ভাবনায় ।

হঠাত্‍ একদিন রিক্সা চালাতে গিয়ে এক্সিডেন্টে পা হারিয়ে পঙ্গু হয়ে গেল মানুষটা ।
মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়লো তার ।কি করে চলবে সংসার?চিকিত্‍সার খরচ জোগাবে কে ?না কেউ ফিরে তাকায়নি ,সবাই যে যার সংসার নিয়ে ব্যস্ত ।বৃষ্টির চোখে নতুন জলেরধারা !না নিজের কষ্টে না ,ওর বাবার কষ্টে , যাকে ও বাবা বলে ডাকতে পারেনি কোনদিন ।যার এতটুকু ভালবাসা যার ভাগ্যে জুটেনি ।
তিনদিন হলো চুলোয় হাঁড়ি উঠেনি ঘরে ।অর্ধাহারে অনাহারে কত আর থাকা যায় ?সবার দুয়ারে হাত পেতেও লাভ হয়নি কোন ,একবেলা খাওয়া জুটেনা যাদের তারা কিভাবে চিকিত্‍সা করাবে পঙ্গু মানুষটাকে ?
সেই মূহুর্তে পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলো বৃষ্টির ছোটবেলার সাথী বিলকিস ।বেশ কিছু টাকা দিয়ে নিজে গিয়ে চাল ডাল কিনে দিয়ে যায় রাতের অন্ধকারে ।সেও এমনি এক অভাগি অভাবের সাথে লড়তে লড়তে এক সময় অন্ধকার জগতে পা বাড়ায় ।

শুরুতে কিছুটা কানাঘুষা হয়েছিলো ,কিন্তু বস্তিতে কে কার খবর রাখে ?সবাই নিজের পেটের ধান্দায় ব্যস্ত ।যারা অভাবের সময় দূরদূর করে তাড়িয়ে দিয়েছিল কুকুরের মত এখন তাদেরকে দেখিয়েই গরিব ফকিরকে টাকা দিয়ে ও তৃপ্তি পায় বিলকিস।নিজের জীবনটাতো গেছেই পাপের পথে ,অন্যকে যদি কিছুটা সাহায্য করে দোষ কি ?

বৃষ্টিদের অভাব দেখে বলছিলো কয়েকবার ,কিন্তু ওকে রাজি করাতে পারেনি ,বৃষ্টি কথা বলতে না পারলেও সব বুঝতো ,সব বুঝাতে পারতো ।বিশেষ করে বিলকিসের সাথেতার বেশ সখ্যতা ছিলো ।

শেষ পর্যন্ত বাবাকে বাঁচাতে নিজেকে মৃত্যুর পথে ঠেলে দেয় বৃষ্টি ।নিষিদ্ধ পল্লির এইসব বালিকারা কতটা কষ্টে প্রতিদিন নতুন করে নিজেকে ইচ্ছে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয় তার খবর কে রাখে ?

ভোরের আলো ফুটে উঠছে চারদিকে,মুয়াজ্জিনের আযান শুনে শিল্পির চেতনা ফিরে আসে যেন ।কিছুতেই ফেরাতে পারেনি বৃষ্টিকে ,বাবার প্রতি বৃষ্টির এ কেমন ভালবাসা?যে তাকে ঘৃণা করে আসছে সারাটা জীবন !শিল্পির মাথায় কিছুতেই ধরেনা ব্যপারটা,লাবনী ম্যাডাম বোধহয় কইতে পারবো এইডারে ভালবাসা কয় নাকি?এইডা কেমুন ভালবাসা ?
একটু পরে দরজায় টোকা পড়ে নিঃশব্দে এসে ঢুকে বৃষ্টি,নিজেকে বিক্রি করে,নিজের স্বত্তার মৃত্যুর বিনিময়ে একমুঠো টাকা এসে মায়ের আঁচলে বেঁধে দেয় !হতবাক মা মেয়েকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে ।বৃষ্টির চোখে আজ আর কোন জল নেই,সব জল চুষে নিয়েছে শকুনের দল ।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s